বৈষম্য কিংবা কোটা” আর “নিয়োগ বিধিমালা” এর তফাৎ না বুঝে বিএসসি আর ডিপ্লোমাকে সুকৌশলে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা রাষ্ট্রকে চরম অশান্তিতে ঠেলে দিতে পারে।

রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য ১০ম গ্রেডের ২য় শ্রেণীর পোষ্ট বরাদ্দ রেখেছে, একই রাষ্ট্র বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য ৯ম গ্রেডের ১ম শ্রেণীর পোষ্টসমূহ বরাদ্দ রেখেছে।
১০ম গ্রেড থেকে প্রমোশন পেয়ে ৩৩% ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তা ৯ম গ্রেডে আসা যেমন বৈষম্য নয়, ঠিক তেমনি ৯ম গ্রেড থেকে ৬ষ্ঠ কিংবা ৫ম গ্রেডে প্রমোশন পেয়ে ১০০% আসাটাও বৈষম্য নয়। চাকরিতে প্রমোশন না থাকলে চাকরি বলতে আর কিছুই থাকবেনা।

যে প্রশ্নগুলো বিতর্ক শুরু করেছে:
বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররা ২য় শ্রেণীর পদে আবেদন করতে না পারা এটা কি আসলেই বৈষম্য নাকি এটা শিক্ষাগত যোগ্যতা মোতাবেক নিয়োগ বিধিমালা? নাকি গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ারদের আসলেই ২য় শ্রেণীর পদে চাকরী করাটা বেমানান কিংবা অসম্মানজনক? ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা ৯ম গ্রেডে আবেদন করতে না পারা এটাও কি আদতে বৈষম্য নাকি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ বিধিমালা? নাকি শিক্ষার ক্যাটেগরী মোতাবেক পদের শ্রেণীবিন্নাস? ডিগ্রী পাস শিক্ষার্থীরা অনার্স পাশ শিক্ষার্থীদের মত করে বিসিএস পরীক্ষায় এপ্লাই করতে পারেনা, এটাকে তাঁরা বৈষম্য ধরে নিয়ে যদি আন্দোলনে নামে এটা কি যৌক্তিক হবে? এটা কি আদতে বৈষম্য নাকি নীতিমালা?
এসব দেখে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীও যদি আন্দোলন শুরু করে আমাদেরকেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একই মান মর্যাদা, সুযোগ সুবিধা দিতে হবে, সমান চোখে দেখতে হবে, না হয় এ বৈষম্য মানবোনা। এটাও কি যৌক্তিক হবে? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ স্টুডেন্ট যদি কাল থেকে মাঠে নামে কেন আমাদেরকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মত সমান চোখে না দেখে বৈষম্যের চোখে দেখা হয়, কেন সকল জায়গায় আমাদের আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয় না, এই বৈষম্য মানি না। এমন দাবী করাও কি আদতে উচিত হবে? চাকরির সংকটের কারণে এদেশে এসএসসি পাশ পদবীতেও হাজার হাজার অনার্স, মাস্টার্স পড়ুয়ারা এপ্লাই করে, চাকরিও করছে, প্রকৃতপক্ষে এটাও কি উচিত? এর চেয়ে উদ্যোক্তা হওয়াটা নিজ এবং রাষ্ট্রের জন্য বেশী কল্যাণকর নয় কি? আবার দেখবেন রাষ্ট্রই কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পাওয়া একজনকে শুধুমাত্র টাইপিং স্পীড দেইখা কয়েকবছর পর প্রোগ্রামার পদে পর্যন্ত প্রমোশন দিয়ে দেয়, যে প্রোগ্রামিং এর “প” ও বুঝেনা। এটাও কি উচিত? প্রমোশনের ক্ষেত্রে মেরিটোক্রেসি বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কতবছর আগে থেকে জ্বি স্যার, জ্বি স্যার বলতে শিখেছেন অলিখিতভাবে সেটাই দেখা হয়, এটাও কি মেধার বিপরীতে বৈষম্য নয়?

তাহলে আসল ঘটনা কি:
শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্র তাঁর বিভিন্ন শ্রেণীর পদে ভিন্ন ভিন্ন নিয়োগ বিধিমালা তৈরি করেছেন, যেটি শিক্ষার মান অনুযায়ী লেয়ারভিত্তিক সন্নিবেশিত। এটাতো স্বাভাবিক একটা সিস্টেম, তাই নয় কি? পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম এভাবেই চলে আসছে। একটা স্পেসেফিক সিস্টেম না থাকলে রাষ্ট্রের আর স্ট্রাকচার থাকেনা, বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। সেজন্য পদ অনুযায়ী ইলিজিবিলিটি ক্রাইটেরিয়া ঠিক করা হয়। এটাইতো হওয়া উচিত, তাই না? (যদিও বড় বড় টেক জায়ান্টরা মাঝে মাঝেই ঘোষণা দেন, টেকনিক্যালি সাউন্ড হলে সার্টিফিকেটও তারা দেখবেনা, আপনি কি বলবেন তখন এটাও সার্টিফিকেটধারীর সাথে চরম বৈষম্য?)

আসল সংকট কোথায়?
সংকট আসলে পর্যাপ্ত চাকরির ব্যবস্থা কিংবা কর্মসংস্থান না থাকা (বেকারের সংখ্যা ২৭লাখ, সরকারি চাকরির শূণ্যপদ আছে মাত্র ৫ লাখ!) মোট কর্মক্ষম গ্র্যাজুয়েট প্রায় ৫৫ লাখ, অথচ সবমিলিয়ে সরকারি চাকরির সংখ্যা মাত্র ২২ লাখ। দেশে মোট চাকরীর মাত্র ৩.১% মানুষ সরকারি চাকরি করার সুযোগ পায়। শত শত ইউনিভার্সিটি খুলে গ্র্যাজুয়েট বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া। এটি সুস্পষ্ট ডিগ্রী ইনফ্লেশান, যা শিক্ষার মানেরও চরম অবনমন। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ গ্র্যাজুয়েট নতুন করে চাকরির বাজারে যুক্ত হয় কিন্তু সে অনুযায়ী পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়না। উদ্যোক্তা হওয়ার প্রসেসটা এদেশে একদিকে যেমন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জিং বিষয়, অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদাগত অবস্থানও সরকারি চাকরির মত বিবেচনা করা হয়না, যা মোটেই উচিত নয়। মহান আল্লাহ ব্যবসাকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। কারিগরী ভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরীর জন্য শিক্ষা বাজেটের কমপক্ষে ১৫%-২০% কারিগরি শিক্ষায় বরাদ্দ থাকা উচিত কিন্তু দূঃখজনক আমাদের মাত্র ৫%-৭%। (চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ায় ২০%-৩০%) সার্টিফিকেটধারী লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার তৈরী করে বেকারের পাইপলাইন বৃদ্ধি করার পরিবর্তে TVET (Technical and Vocational and Training) এর দিকে সরকারের মনোযোগ না দেওয়া।

সমাধান কিসে ?
চাকরির প্রতি লোভ লালসা বাদ দিয়ে উদ্যোক্তা হওয়াটাকে বিয়ের বাজারসহ সব জায়গায় সম্মানের বিষয় বানাতে হবে। পাশাপাশি উদ্যোক্তা হতে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্রকে বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বিশেষ প্রণোদনাসহ প্রশিক্ষণ হাব তৈরি করতে হবে এবং সামাজিক স্বীকৃতি দিতে হবে। লাগামহীনভাবে শত শত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে শিক্ষিত বেকার তৈরির পথ বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার মূল্য ধরে রাখতে Degree Inflation নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মানীর মত টেকনিক্যাল এডুকেশনে বিনিয়োগ (২০% – ৩০%) বাড়াতে হবে। শিক্ষার ক্যাটেগরী অনুযায়ী সরকারি খাতে বিশেষ করে ৯ম গ্রেডে ব্যাপক কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে এবং গেজেটভূক্তদের মত সকল পর্যায়ের ৯ম গ্রেডের সুযোগ সুবিধা একই ও বৈষম্যহীন করতে হবে।

পরিশেষে, জনসংখ্যায় আমরা এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডে অবস্থান করছি অর্থাৎ কর্মক্ষম জনসংখ্যা, নির্ভরশীল জনসংখ্যার তুলনায় বেশী। বিশ্ব মানচিত্রে তারাই উন্নতির শিখরে উঠেছে যারাই বিশাল এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে গড়ে তুলে দেশের জন্য কাজে লাগাতে পেরেছে। সম্ভাবনাময় এ তারুণ্যকে শুধুমাত্র মিছিলে আর স্লোগানে ডুবিয়ে রাখলে দেশ কিন্তু আগাবেনা। সুতরাং সময় থাকতে মূল সংকট খুঁজুন, একদম গোড়া থেকে সংস্কারের আওয়াজ তুলুন, চর্মচক্ষু দিয়ে যা দেখছেন তা নিয়েই মাঠে নেমে পরার চেয়ে বক্সের বাইরে এসে থার্ড আই দিয়ে দেশকে দেখুন, নিজেদের মধ্যে অহেতুক কামড়াকামড়ি বন্ধ করুন। দেশের জন্য আপনাদের সবাইকেই প্রয়োজন।

প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ
ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর, সার্ক অঞ্চল, গ্লোভাল ইয়ুথ পার্লামেন্ট

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version